বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও আগামী প্রজন্ম: মিঠুন

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও আগামী প্রজন্ম: মিঠুন

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও আগামী প্রজন্ম

শিক্ষা মানুষের মাঝে সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করে এবং মনকে সৃষ্টিশীল কাজে চালিত করে। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা ব্যস্থায় আমাদের শিশুরা নানা জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন। কথায় আছে “যায় দিন ভালো যায় আসে দিন খারাপ” ঠিক কথার কথাটাই আজ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বর্তমানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন এক অবস্থায় চলে যাচ্ছে যেখানে শুধু শিক্ষার্থীদের উপরে অমানবিক বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু শিশুদের মেধার কোন মূল্যায়ন করছি না, শুধু মাত্র সনদের প্রাপ্তিটাই আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। মা-বাবারাও কেবলি সন্তানদের উপর নিজেদের ইচ্ছে গুলোকে চাপিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি এত এত পড়ার চাপ আর এত এত পরীক্ষা আপনার আমার সন্তানের উপর কি মানষিক চাপ সৃষ্টি করছেনা? কেড়ে নিচ্ছে কিনা ওরের শৈসব খেলাধুলার অধিকার?

যেখানে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী নিজেই বলেছেন খোলাধুলার মাধ্যমেই একজন শিশু দেশের সু-নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। আসলে বর্তমান শিশুরা শহরে কতটা খেলাধূলার সুযোগ পাচ্ছে। আমরাই বলে থাকি যে আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ কিন্ত আমরা আমাদের সন্তানদের কোন ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে ঢাকা শহরে বেশিরভাগ স্কুলেই খেলাধুলার পর্যাপ্ত জায়গা নাথাকার কারণে শিশুরা তাদের খেলার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার কিছু স্কুলে খেলার মাঠ থাকা সত্বেও অধিক পড়াশোনার চাপে খেলার সময় পাচ্ছেনা।

যে সময়টাতে একটি শিশু হেসে খেলে বেড়ে উঠবার কথা সেই সময়টাতে আমরা আমাদের সন্তানদেরকে ঠেলে দিচ্ছি অসুস্থ্য পরিক্ষা নামক প্রতিযোগীতায়। বর্তমান সময়ে মা বাবার ডিকশনারীতে ফেল নামের কোন সব্দ নেই, আছে সুধু গোল্ডেন আর এ প্লাস পাওয়ার উচ্চ আকাঙ্খা। কিন্ত আমরা কি কেউ একটিবারও চিন্তা করি এতে আমার সন্তানের মানুষিক চাপ কতটুকু বাড়তে পারে! খুবি অবাক লাগে আজকাল একটি শিশু যার বয়স মাত্র ৩/৪ বছর তাকে মা-বাবা সখের বসে তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিলো। শিশুরা যখন কিন্ডার গার্ডেন/নার্সারি/কেজিতে পড়ে তখন তাদের বইয়ের সংঙ্খা ১২-১৩ টি সপ্তাহে একদিন আবার ক্লাস টেস্ট পরিক্ষা দিতে হয়। চিন্তা করা যায় একটি শিশু যার বয়স মাত্র ৩/৪ বছর সে এতগুলো বই পড়বেইবা কি করে! আর পরিক্ষাই বা দিবে কি করে!

বর্তমান সময়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কেবলি মুখস্থ বিদ্যা অর্জনের দিকে যাচ্ছে, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরাই জ্ঞান অর্জনের চেয়ে পরিক্ষায় পাশ মার্কের দিকেই ঝুকছে। এজন্য আমাদের অভিভাবকেরাই শুধু দায়ী নয়, এজন্য অধিকাংশ দায়ী বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু মাত্র নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান কে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ তালিকায় রাখার প্রতিযোগীতায় লেগে থাকে আর শতভাগ পাশের চিন্তায় থাকে তারা ভাবেনা যে আমাদের শীক্ষার্থীরা কতটা মানবিক গুনাবলি অর্জন করলো কতটুকু সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠলো।

একদল অসাধু শিক্ষা ব্যবসায়ীরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে দিন দিন বানিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এতেই বোঝা যায় যে শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড, আসলে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি কতটা মেরুদন্ড সোজা রাখতে পারছে!

আজকাল অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের স্কুলে ভর্তি হতে হলে ব্যক্তিগত গাড়ি অবশ্যই থাকতে হবে এমন দিকনির্দেশনাও দিয়ে থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাহলে এখানে শিক্ষার অধিকার কি লুণ্ঠিত হলোনা? কিন্তু আমরা জানি যে শিশু যদি নিরাপদে কাছে হেটে স্কুলে যাতায়াত করে এতে ওর শারিরিক ও মানুষিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। শহরে স্কুলের বেশীর ভাগ শিশুরই স্কুলে যাতায়েতের একমাত্র বাহন হচ্ছে গাড়ি নির্ভর যার ফলে শিশুরা অনাকাঙ্খিত স্বাস্থ্যঝুকি মুটিয়ে যাওয়া ও হরমোন জনিত রোগসহ নানা সমস্যায় ভুগছেন।

আমাদের কে সঠিক পথ খুজে বের করতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন মানসম্পন্ন স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। আমরা অনেক সময়ই বলে থাকি যে আমার সময়ের মূল্য অনেক বেশি। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায় অনেক বাবা মা তাদের সন্তানদেরকে অনেক দুরের স্কুলে ভর্তি করে থাকেন। কিন্তু এতে করে যানজটে পরে তাদের যে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে সে দিকে কেউই খেয়াল করেন না। অথচ সেই সময়টাকে কিন্তু আরেকটি গুরুত্তপূর্ন কাজে লাগাতে পারতেন।

দিন দিন শতভাগ শিক্ষার হার বেড়ে যাচ্ছে, আমরা এমনটাই বলে থাকি। আসলে আমাদের সন্তানেরা কতটা সুশিক্ষিত জাতি হিসেবে বেড়ে উঠছে সে ব্যপারে কেউই নজর দিচ্ছি না। যেখানে সরকারি স্কুলগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের জন্য বাংলা, ইংরেজি ও অংক এই তিনটি বই নির্ধারন করে দিয়েছে, সেখানে বেসরকারি স্কুলগুলো বাচ্চাদের উপরে ১২-১৩ টি বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে আর বানিজ্যিক চিন্তা মাথায় রেখে পরিক্ষার পরিমান বাড়িয়েই যাচ্ছে।

বর্তমানে প্রিন্ট ও টেলিভিশন মিডিয়াতে হরহামেসাই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে তৃতীয় শ্রেনী পর্যন্ত কোন পরিক্ষা থাকবেনা আর সমাপনী পরীক্ষা পদ্ধতি তুল দেয়া হবে ভেবেছিলাম। সরকারি এই সিদ্ধান্ত আসলেই যুগ-উপযোগী এতে করে শিশুরা অন্ততপক্ষে খেলাধুলার মাধ্যমে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। কিন্ত আদোও তার কোন সু-ফল চোখে দেখা যাচ্ছেনা।

বরং শিশুরা অধিক পড়াশোনার চাপে স্কুল/কোচিং আর গৃহবন্দী হয়ে পড়ছে। আসক্ত হয়ে পড়েছে মোবাইল, ইন্টারনেট আর কম্পিউটারের গেমের প্রতি। এর ফলে শিশুরা নানাবিদ সমস্যায় পড়ছে আর অস্বাভাবিক ভাবে মানবিক গুনাবলির বিচ্যুতি ঘটছে। এর ফলে শিশুরা সৃজনশীলতা ও চিন্তা শক্তি হারাচ্ছে।

এর থেকে বেড়িয়ে আসতে হলে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষা ব্যাবস্থা থেকে প্রথম শ্রেনী থেকে পঞ্চম শ্রেনী পর্যনন্ত, সকল পরীক্ষা পদ্ধতি তুলে নেয়া উচিৎ এবং শিক্ষা ও সামাজিক নানা অবকাঠামো সমুহগুলো ঢেলে সাজানো খুব জরুরী। শিশুদের কে ওদের মত করে বড় হতে দিতে হবে ওরা জ্ঞান অর্জন করবে নিজ আপন মনে, নতুন কে জানবে শিখবে নিজের মতো করে।

তবেই কেবল আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ ও সু-নাগরিক হয়ে উঠবে এবং ভুমিকা রাখবে দেশর সার্বিক উন্নয়নে, যেটা আমাদের সকলেরই কাম্য।

লেখক: মোঃ মিঠুন
সমাজ উন্নয়ন কর্মী

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

themesbazartvsite-01713478536